স্টাফ রিপোর্টার
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা, কাকুয়া, বাঘিল, মাহমুদনগর ইউপির যমুনা তীরবর্তী পাঁচটি চর—মহেষপুর, জাঙ্গালিয়া, মিলুয়ার চড়, চিপিচাপড়ি ও সৌরদউল। দিনের বেলায় নদী পাড়ের সাধারণ জীবন চলে যেমন তেমন, কিন্তু রাত নামতেই এই জনপদের দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি চক্র। নদীর বুক চিরে বালি তোলার অবৈধ ড্রেজারের শব্দ যেন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে মানুষের মনে ঢুকে দেয় ভীতি, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছায়া।

পুরোনো চক্রের পুনরুত্থান
২০২৩ সালে সর্বহারা চক্রের ৭৮ সদস্য আত্মসমর্পণের পর স্থানীয়রা মনে করেছিলেন—হয়তো শুরু হবে শান্তির নতুন অধ্যায়। তবে দুই বছরের ব্যবধানে আবার সেই পরিচিত মুখই ফিরেছে পুরোনো রূপে। অভিযোগ উঠেছে—রাতের অন্ধকারে ফের চালু হয়েছে বালু লুট, চাঁদাবাজি ও ত্রাস।
নদী ভাঙন এখন আরও ভয়াবহ। শিশু, নারী, জেলে, মাঝি—সবাই ভীত। কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, ফসলি জমি প্রতিনিয়ত ধসে পড়ছে নদীর গহ্বরে। নদী গিলে খাচ্ছে চরের পর চর। স্থানীয়রা বলছেন, “এই গতিতে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে যমুনা বহুমুখী সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়বে।”
রাত্রিকালীন আতঙ্ক: মাঝি ফারুকের উপর হামলা
৩ ডিসেম্বর রাতে নদীপথে ট্রলার চালাচ্ছিলেন মাঝি ফারুক হোসেন। দূর থেকে ড্রেজারের শব্দ পেয়ে তিনি সন্দেহ করেন অবৈধ বালু উত্তোলনের। মুহূর্তেই শুরু হয় তার দুঃস্বপ্নের অধ্যায়। ফারুকের অভিযোগ—ড্রেজার চক্র তাকে তুলে নিয়ে মারধর করে এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
পরে টহলরত নৌ-পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
তবে নৌ-পুলিশ সুপার দাবি করেছেন, “ঘটনাটি অপহরণ নয়; ওই ব্যক্তিকে সন্দেহজনক অবস্থানে আটক করা হয়েছিল।”
বিতর্ক ও জনমনে প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ব্যাখ্যা জনমনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—
“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে কোনো ব্যক্তি বা চক্র কি সাধারণ মানুষকে আটক করতে পারে?”
স্থানীয়দের দাবি—এভাবে চোরাই ড্রেজিং চক্রের ‘আটক’ নামে হয়রানি প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের রাতের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে।
প্রশাসনের অবস্থান
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ইউএনও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—
“টাঙ্গাইল সদরে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। ঘটনাস্থলে টিম পাঠানো হয়েছে।”
তবে স্থানীয়রা বলছেন— অভিযান শেষ হয়, আতঙ্ক শেষ হয় না। কিছুদিন স্তব্ধ থাকলেও আবার সেই পুরোনো চক্র রাতের অন্ধকারকে আশ্রয় করে নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বিপন্ন পরিবেশ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
অবৈধ ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যাচ্ছে। ফলে
—
তীব্র নদী ভাঙন
বসতভিটা হারাচ্ছে মানুষ
কৃষিজমি বিলীন
নৌচলাচলে চরম ঝুঁকি
যমুনা বহুমুখী সেতুতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা
স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে জাতীয় স্বার্থই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
শেষ কথা
যমুনা তীরের মানুষের রাত শেষ হয় আতঙ্কে, সকাল শুরু হয় ক্ষত নিয়ে। অবৈধ ড্রেজিং চক্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ না হলে এই জনপদের শান্তি আর নিরাপত্তা ফেরার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত, কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপই পারে নদীপারের মানুষকে রক্ষা করতে—অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ হোক—নিরাপদ হোক নদী জনপদ।
সম্পাদক : শেখ মোঃ শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল
যোগাযোগ: ০১৭১১৭৫২৭১৭০ / ১৭১১৩৬৩৭৯৭