একটি ১৯ বছরের মেয়ের জীবনের শেষ যাত্রাটিও যেন আরেকটি কঠিন বাস্তবতার গল্প হয়ে উঠল।সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মরদেহ রাজধানী থেকে সাতক্ষীরার বাড়িতে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই মরদেহ বহনের অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াটুকুও জোগাড় করতে পারেনি তাঁর পরিবার। স্বজনদের ১৭ হাজার টাকা ধার করে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন মরিয়মের ফুফা সিকান্দার। পরিবারের অভিযোগ, এমন সংকটের সময়ও এমপির পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তাদের খোঁজ নেননি। তথ্যসূত্র এশিয়া পোস্ট ভাবুন একবার।
যে মেয়েটির মৃত্যুকে ঘিরে এখন জাতীয় পর্যায়ে এত আলোচনা, এত প্রশ্ন, এত আইনগত প্রক্রিয়া, তাঁর মরদেহ বাড়ি নেওয়ার সময় পরিবারকে অ্যাম্বুলেন্সের ১৭ হাজার টাকা জোগাড় করতে ধার করতে হচ্ছে।আর এই মৃত্যুর ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়।রোববার রাতে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাঁর বাবা মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং পুলিশ দুজনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুটও উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেটি মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা এখনো ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়। ফলে চিরকুটে কী লেখা ছিল বা সেটির দায় কার, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।তবে এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে।
জুলাইয়ে গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি প্রকাশ্যে মরিয়মকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর তাঁর একটি চাকরির জীবনবৃত্তান্ত সামনে আসে, যেখানে ২২ জুনের তারিখে গাজী নজরুল ইসলামের ‘জোর সুপারিশ করছি’ লেখা স্বাক্ষর থাকার কথা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই নথিতে মরিয়মকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে। অথচ নজরুলের দাবি অনুযায়ী তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ১৭ জুন। এই অসঙ্গতি নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
সেই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে আরও গুরুতর প্রশ্ন।চাকরির সুপারিশের সূত্র ধরে কি তাঁদের পরিচয় হয়েছিল? বিয়ের পর সম্পর্কের মধ্যে কী ঘটেছিল? মরিয়ম তাঁর পরিবারের কাছে কোনো নির্যাতন বা চাপের কথা জানিয়েছিলেন কি না? উদ্ধার হওয়া চিরকুটের সত্যতা কী? মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কার কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল?এসব প্রশ্নের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুমান দিয়ে নয়, তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে হবে।কারণ একজন তরুণীর মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের উপকরণ হওয়ার আগে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি।আর আজ সেই পরিবার মেয়েটির মরদেহ বাড়ি নেওয়ার জন্যও ১৭ হাজার টাকা ধার করছে।এই দৃশ্যটি আমাদের সমাজের জন্যই একটি নির্মম প্রশ্ন রেখে যায়।মৃত্যুর পরও কি একজন অসহায় মানুষের শেষ যাত্রাটুকু নিশ্চিত করার মতো মানবিক দায়িত্ব আমরা নিতে পারি না?
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কেউ দায়ী কি না, নিরপেক্ষ তদন্তে তা স্পষ্ট হোক। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক, আর কেউ নির্দোষ হলে সেটিও তদন্তেই পরিষ্কার হোক।কিন্তু মরিয়মের পরিবার যেন অন্তত তাঁর শেষ বিদায়টুকু মর্যাদার সঙ্গে দিতে পারে।
সম্পাদক : শেখ মোঃ শাহিনুর রহমান উজ্জ্বল
যোগাযোগ: ০১৭১১৭৫২৭১৭০ / ১৭১১৩৬৩৭৯৭