
কক্সবাজারে পর্যটকের সঙ্গে একটি খাবারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া অভিযোগ শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে থানায় মামলা ও গ্রেপ্তার পর্যন্ত।অভিযোগটি করেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে তিনি উঠেছিলেন হোটেল সী-গালের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে।
রাসেলের দাবি, হোটেলের রেস্তোরাঁয় পরিবারের জন্য দেশি মুরগির মাংস অর্ডার করার আগে তিনি একাধিকবার নিশ্চিত হন যে সেটি দেশি মুরগিই হবে। কিন্তু খাবার পরিবেশনের পর স্বাদ নিয়ে সন্দেহ হয়। পরে অভিযোগ করলে হোটেল কর্তৃপক্ষ নাকি স্বীকার করে যে তাদের ‘দেশি মুরগি’ হিসেবে সোনালি মুরগি পরিবেশন করা হয়েছে।এখানেই ঘটনা শেষ হয়নি।রাসেল বিষয়টি জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলকে জানান এবং পরে সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাতেও অভিযোগ করেন। তার অভিযোগ, এরপর হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসান তাকে ফোন করে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলে ভয় দেখান।
বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই ম্যানেজার হোটেলটির এমডির সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। এমনকি হোটেলটি ‘তারেক জিয়ার হোটেল’ নামে পরিচিত বলেও দাবি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।অডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এরপর শনিবার রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। পুলিশ জানিয়েছে, পর্যটককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।অন্যদিকে হোটেল সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল জানিয়েছেন, ঘটনার পর অভিযুক্ত ম্যানেজারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের আচরণ প্রতিষ্ঠানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শুধু হুমকির অভিযোগ নয়, খাবার নিয়ে রাসেলের লিখিত অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।কোনো হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনীতিকের সম্পর্ক থাকলেও সেটি কোনো গ্রাহককে ভয় দেখানোর লাইসেন্স হতে পারে না। একইভাবে খাবারের ক্ষেত্রে গ্রাহক যে পণ্য অর্ডার করেছেন, সেটিই সঠিকভাবে সরবরাহ করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য না দেওয়া একটি মৌলিক ব্যবসায়িক দায়িত্ব।
আর অভিযোগটি যদি সত্যিই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু একজন পর্যটককে হুমকি দেওয়ার ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করার একটি গুরুতর প্রশ্নও তৈরি করে।তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। পুলিশ মামলা করেছে, একজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং খাবার পরিবেশন নিয়ে ভোক্তা-অধিকার কর্তৃপক্ষও তদন্ত করছে। এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের প্রতিটি অংশের সত্যতা যাচাই।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ:একজন পর্যটক খাবারের বিষয়ে অভিযোগ করলেই কি তাকে রাজনৈতিক প্রভাবের ভয় দেখানো যাবে?নাকি দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নামও সাধারণ একজন নাগরিকের অধিকার রক্ষার সামনে কোনো ঢাল হতে পারবে না?এই ঘটনার তদন্তের ফলই সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে।