
নিজস্ব প্রতিবেদক | এইচ এম শাহীন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই কুমিল্লার দেবিদ্বারে ঘটেছে চাঞ্চল্যকর জোড়া হত্যাকাণ্ড। এবার নিজ বাড়িতে ছেলের হাতে মা এবং আট মাস বয়সী ভাতিজি নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিশুটির মা ও অভিযুক্তের ভাবি রাবেয়া বেগম গুরুতর আহত হয়েছেন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের বড়শালঘর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার নোয়া বাড়ির মোস্তফা মাস্টারের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন—মৃত ফরিদ উদ্দিনের স্ত্রী পেয়ারা বেগম (৬৩) এবং তার আট মাস বয়সী নাতনি ইসরাত জাহান। আহত রাবেয়া বেগম নিহত শিশু ইসরাত জাহানের মা এবং অভিযুক্ত ইমনের বড় ভাই সুজনের স্ত্রী।স্থানীয় বাসিন্দা মো. শামীম আহসান জানান, সকালে ওই বাড়ি থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে যান। পরে ঘরের মেঝেতে পেয়ারা বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ এবং খাটের ওপর শিশুটির নিথর দেহ দেখতে পান তারা। স্থানীয়রা ইমনকে ঘরের ভেতরে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন।
পেয়ারা বেগমের নিকটাত্মীয় মহেশপুর গ্রামের সাকিব মিয়া জানান, ইমন দীর্ঘদিন ধরে পায়ের সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। রোববার তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়।সাকিব মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে ইমন তার মাকে বলেছিলেন, ‘আমি আর কখনো সুস্থ হব না, আমাকে মেরে ফেলো; না হলে আমি তোমাকে মেরে ফেলব।’ তবে এর সঙ্গে পরদিনের হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
স্থানীয়দের দাবি, সোমবার সকালে কথাবার্তার একপর্যায়ে ইমন ঘরের খাটের নিচ থেকে একটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার মা পেয়ারা বেগমকে আঘাত করেন। মায়ের চিৎকার শুনে রাবেয়া বেগম আট মাস বয়সী মেয়ে ইসরাত জাহানকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এলে ইমন শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে নিয়ে মাটিতে আছাড় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে শিশুটিকে রক্ষা করতে গেলে রাবেয়া বেগমকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে আহত রাবেয়া বেগমকে উদ্ধার করে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর ফরিদ উদ্দিনের বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড় করেন। পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত ইমনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার দীর্ঘদিনের মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তবে ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তাধীন।
ওসি আরও বলেন, জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা ও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।এদিকে আহত রাবেয়া বেগমের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সুজিত কুমার সাহা। তিনি জাতীয় দৈনিক আজকের দুর্নীতিকে জানান, সোমবার সকালে রাবেয়া বেগমকে জরুরি বিভাগে আনার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা না যাওয়া পর্যন্ত তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ব্যবহৃত অস্ত্র, ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং অভিযুক্তের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তদন্তের পরই বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।