
নজরুল ছিলেন প্রেমের কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি ও দ্রোহের কবি।
নজরুলের জীবনে দুই নারী ছিল তার স্ত্রী। একজন নার্গিস আর একজন আশা লতা সেন গুপ্তা (দুলি)। প্রথম বিয়ের স্ত্রীর সাথে ঘর করা হয়ে ওঠেনি। এ বিয়ের তিন বছর পর দ্বিতীয় বিয়ে হয় প্রমীলার সাথে।
নজরুলের প্রেম ও বিয়ে দুই বাংলায় দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আলী আকবর খান কলিকাতার এক প্রকাশক, নজরুলকে তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে মুরাদনগরের দৌলতপুরে নিয়ে আসেন। তার সাথে নজরুল পূর্ব হতে পরিচিত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নজরুল যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, সেই সুবাদে তখন ক্যাপ্টেন আলী আকবর খানের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বিবাহযোগ্য সুন্দরী ভাগ্নি ছিল, তার নাম সৈয়দা খাতুন। নজরুল পরে তার নাম রেখেছিলেন নার্গিস আসার খানম। ইচ্ছা ছিল নজরুলের সাথে ভাগ্নিকে বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই করে রাখবেন এবং নজরুলকে দিয়ে কাব্য রচনা ও পাঠ্য বই লিখিয়ে তার প্রকাশনার ব্যবসা রমরমা করে তুলবেন। সৈয়দা খাতুন এর পিতা মুন্সি আব্দুল খালেক, মা আসমাতুন্নেসা।
দৌলতপুরে আলী আকবর খান নজরুলকে উষ্ণ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করলেন। নজরুলের সম্মানে তোরণ নির্মাণ করা হয়। সেখানে নজরুলের কবিতা ও গান শোনার জন্য ছুটে আসতেন অজস্র লোক, মানুষ মুগ্ধ হয়ে যেত। প্রতি রাত্রে নজরুল দীঘির পাড়ে, আমতলায় শীতলপাটি বিছিয়ে গানের আসরে বসতেন এবং দীঘির ঘাটে গভীর রাত পর্যন্ত বাঁশি বাজাতেন। সেই বাঁশির সুর মুগ্ধ করলো পল্লী বালিকা নার্গিসকে। একদিন নার্গিস নজরুলকে বললো, আপনি কি রাত্রে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন? আমি শুনেছি। আপনি কি আমাকে বাঁশি বাজানো শিখাবেন? নজরুল ও তাকে পছন্দ করতেন। এরপর থেকে উভয়ের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে যায়। আবেগ তাড়িত বিয়ে ১৯২১ সালের ২১শে জুন সম্পন্ন হয়। বিয়ের রাতেই কবি জানতে পারেন তাকে ঘর জামাই হিসেবে দৌলতপুরেই থেকে যেতে হবে। এ প্রস্তাবে রাজি না হয়ে স্বাধীনচেতা নজরুল সে রাতেই অভিমান করে ১১ মাইল পথ পায়ে হেঁটে চলে যান কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন বিরজাসুন্দরী দেবীর পুত্র রবীন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত।
কবি দৌলতপুর ত্যাগ করে কুমিল্লা কান্দিরপাড় সেন বাড়িতে অত্যন্ত আদরের সাথে ঠাই পান।
মোট ২১ দিন তিনি সেখানে অবস্থান করেন। আলী আকবর খান এর মাধ্যমেই ১৯২১ সাল থেকেই এ বাড়িতে নজরুলের জানাশোনা। নজরুল ট্রেনযোগে কুমিল্লায় পৌঁছে আলী আকবর খানের স্কুলের বন্ধু রবীন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত এর বাড়িতে ওঠেছিলেন। তখন থেকেই সেন বাড়িতে নজরুলের আসা যাওয়া। বিরজা সুন্দরীকে নজরুল মা বলে সম্বোধন করতেন। শীঘ্রই বিরজা সুন্দরীর স্নেহের পাত্র হয়ে ওঠেন নজরুল। অতিথিসেবা করতেন কুমারী প্রমীলা (দুলি)। সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রমীলা নাচ-গানে অংশগ্রহণ করতেন। তিন বছর পর নজরুলের বিয়ে হয় আশা লতা সেন গুপ্তা (দুলির) সাথে। আশা লতা হলেন বিরজা সুন্দরীর ভাসুর বসন্তকুমার সেন গুপ্তের মেয়ে। ছোটবেলায় ডাকনাম ছিল দোলনা (দুলি) । আশালতার মা গিরিবালা দেবী ১৯২৪ সালের ২৪ শে এপ্রিল মেয়েকে বিয়ে দেন নজরুলের সাথে। অনুষ্ঠান হয় বেনিয়া লেনের ৬নং হাজী লেনে, কলিকাতা। বিয়ের পর নজরুল তার নাম দেন প্রমীলা।
অনেকে ধারণা পোষণ করেন, কপালে সিঁদুর পরে প্রমীলার বিয়ে হয়। এ বিয়ে হয় মুসলিম রীতি অনুসারে ১৩৩১ বঙ্গাব্দ ১২ই বৈশাখ। (১৯২৪সালের ২৪ এপ্রিল) কবি ভালোবেসে ছিলেন তার প্রিয়সী প্রমীলাকে, ভালোবেসে ছিলেন প্রমীলার স্মৃতিঘেরা জন্মভূমি ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা, ঐতিহ্যবাহী তেওতা গ্রামকে। তেওতা মানিকগঞ্জ মহকুমার ঢাকা জেলার শিবালয় থানার একটি গ্রাম, সেখানে জন্ম হয় প্রমীলার। তাদের পরিবারটি চলে আসে কুমিল্লায়। নজরুল প্রমীলা কে নিয়ে একটি কাব্য উৎসর্গ করেন “দোলনচাঁপা”। এদিকে নার্গিসের বিয়ে হয় আজিজুল হাকিম এর সাথে। তিনি ছিলেন পূর্ব বাংলার একজন নজরুল ভক্ত, অবশিষ্ট জীবন নজরুলের রাখা নার্গিস নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ১৯৩৭ সালে নার্গিস-নজরুল কে একটি চিঠি লিখেন। উত্তরে নজরুল একটি গান লিখে দেন।
যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই
কেন মনে রাখো তারে?
ভুলে যাও মোরে, ভুলে যাও একেবারে।
আমি গান গাহি আপনার দুঃখে
তুমি কেন এসে দাঁড়াও সমুখে?
আলেয়ার মত ডাকিও না আর নিশিত অন্ধকারে।।
নার্গিস আসার খানম ওরফে সৈয়দা খাতুন কে উপলক্ষ করে কবি বিভিন্ন কাব্য ছায়ানট, চক্রবাক, পূবের হাওয়া, অনুরূপ পঞ্চাশটি কবিতা লিখেন।
“প্রেম”কবি মানসের প্রধান প্রেরণা। কবি নজরুলের অন্তর তো প্রেমময় হবেই। আরো কয়েক রমণীর সাথে প্রেম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তার। কেননা কবির মর্মস্পর্শী গান ,কবিতায় অনেকেই মুগ্ধ হয়ে পড়তেন। আর তার লেখা ছিল অসাম্প্রদায়িক। তার দীর্ঘ দৈহিক অবয়ব, আর ঢেউ খেলানো চুল আকর্ষণীয় ছিল। আরেক জনের নাম এসেছে প্রতিভা বসু, পারিবারিক নাম ছিল রানু সোম। বিখ্যাত কবি বুদ্ধদেব বসুর সাথে তার বিয়ে হয়। বনগ্রাম লেনে তাকে গান শিখাতেন। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক পাড়ার ছেলেরা তা সহ্য করতে পারেনি। কয়েকজন যুবক কবির উপর হামলা চালায়। সেনা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নজরুল হঠাৎ একজনের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। পরে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
মিস ফজিলাতুন্নেছা (জোহা)র নাম আসে । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম মুসলিম মহিলা ছাত্রী। পড়তেন গণিত বিভাগে। ১৯২৮ সালে কবির সাথে পরিচয় হয় দ্বিতীয় বার্ষিক মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে। বারবার প্রেম নিবেদন করে ও নজরুল সাড়া পাননি। কাজী মোতাহার হোসেন কবির বন্ধু, একদিন দুজনে গেলেন ফজিলাতুন্নেছার বাসায়। কবি একটু একটু জ্যোতির্বিদ্যা জানতেন। শুরু হলো হাত দেখা, ভাগ্য রেখা, আয়ু রেখা, বিদ্যারেখা, প্রেম রেখা। হাতে হাত কিন্তু চোখে চোখ আর হয়ে ওঠেনি। ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন নজরুল মন পড়ে রইলো এখানেই। সঞ্চিতা বইটি ফজিলাতুন্নেছার নামে উৎসর্গ করেন।
কবি কানন দেবীকে গান শিখাতেন। তাকে ঘিরে মুখরোচক প্রেমের ঘটনা ঘটেছিল যা অনেকেরই অজানা।
ওমা মৈত্রকে গান শিখতেন কবি। ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল সুরেন্দ্রনাথ এর মেয়ে ওমা ম