
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার দরিদ্র মাছ বিক্রেতা বাবুল মিয়া (৪২) ভুল চিকিৎসার কারণে একটি কিডনি হারিয়ে বর্তমানে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তিতে রয়েছেন। চিকিৎসা জটিলতার পাশাপাশি তিনি এখন স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হুমকি-ধামকিতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাবুল মিয়া গত ১ জুন ২০২৫ তারিখে শারীরিক সমস্যার কারণে একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। কর্তব্যরত চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষ করে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে জানান—রোগীর ডান কিডনিতে একটি সিস্ট রয়েছে, তবে বাম কিডনি সম্পূর্ণ সুস্থ। তাকে ওষুধ দেওয়া হয় এবং পরবর্তী ধাপে IVU (Intravenous Urography) পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এরপর ৩ জুন বাবুল মিয়া তাঁর আত্মীয়ের মাধ্যমে তাড়াইল নিউ লাইফ হাসপাতালে যান ডা. এরশাদ আহসান সোহেল-এর কাছে, যিনি নিজেকে ইউরোলজিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন। ডা. সোহেল আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে দাবি করেন রোগীর বাম কিডনিতে পাথর আছে এবং তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন। কোনো বিস্তারিত রিপোর্ট ছাড়াই তিনি ৩৫ হাজার টাকায় অপারেশনের চুক্তি করেন এবং সেই রাতেই অপারেশন শুরু করেন।
অপারেশনের কিছুক্ষণ পর ডাক্তার সোহেল রোগীর বড় ছেলেকে অপারেশন থিয়েটারে ডেকে জানান, কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে এবং তা শরীরে রাখলে ক্যান্সার হতে পারে—এই বলে ছেলের স্বাক্ষর নিয়ে কিডনি অপসারণ করেন। অপারেশনে এনেস্থেশিয়া দেন ডা. শান্ত এবং সহযোগিতা করেন স্যাকমো শামীম হোসেন, যদিও বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল)-এর নিয়ম অনুযায়ী স্যাকমো দ্বারা সার্জিক্যাল সহায়তা দেওয়া আইনবিরুদ্ধ।
৬ জুন রোগীকে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে কিডনি কেটে ফেলার বিষয়টি জানানো হয়নি। পরে অপারেশন স্থানে ইনফেকশন দেখা দিলে তিনি বারবার চিকিৎসকের কাছে যান। একপর্যায়ে ২৫ আগস্ট এমআরআই পরীক্ষায় জানতে পারেন তাঁর বাম কিডনি সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়েছে।
এই তথ্য জানার পর তিনি ডা. সোহেলের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে, সোহেল তাকে বিষয়টি “গোপন রাখতে” বলেন এবং পুনরায় কিশোরগঞ্জ পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাড়াইল নিউ লাইফ হাসপাতালে নিয়মিত ড্রেসিং করার পরামর্শ দেন। কিন্তু রোগীর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতি হতে থাকে।
পূর্ববর্তী রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও বাবুল মিয়ার ডান কিডনিতে সিস্ট পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু বাম কিডনিতে কোনও সমস্যা ছিল না। একই ফলাফল ১ জুনের পরীক্ষাতেও দেখা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, ডা. সোহেল নিজেকে ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিলেও তাঁর কিডনি বা ইউরোলজিতে কোনও উচ্চতর ডিগ্রি নেই। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে তিনি নিজেকে ‘MBBS, PGT (Surgery, Urology)’ হিসেবে পরিচয় দিলেও কিশোরগঞ্জ পপুলার হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন প্যাডে নিজেকে ‘MS (Urology)’ ডিগ্রিধারী বলে উল্লেখ করেন।
রোগী বাবুল মিয়া জানান, ভুল চিকিৎসায় কিডনি হারানোর পরও ডা. সোহেল তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর তাড়াইল নিউ লাইফ হাসপাতালে দেখা করতে গেলে স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সোহেল তাঁকে হুমকি দেন এবং ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করতে বলেন।
এরপর ৫ অক্টোবর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে এক সালিসি বৈঠকে বাবুলকে বলা হয়, “থানা বা আদালতে গেলে কোনও লাভ হবে না,” এবং কিছু টাকা নিয়ে চুপ থাকার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
বর্তমানে বাবুল মিয়া শারীরিকভাবে অসুস্থ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে রয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভুল চিকিৎসার তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আবেদন জানিয়েছেন।