
এনামুল, প্রতিবেদক
মানবসেবার পবিত্র পেশা চিকিৎসা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে নানা প্রতারণা ও অপচিকিৎসার ছোবলে ক্ষতিগ্রস্ত। আধুনিক চিকিৎসা, ব্যানার–ফেস্টুন ও আকর্ষণীয় প্রচারণার আড়ালে একটি চক্র নিজেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলাও এই প্রতারণার ব্যতিক্রম নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ—এলাকাজুড়ে সক্রিয় ভুয়া চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
৪৫ বছরের অভিজ্ঞতার দাবি, কিন্তু নেই স্বীকৃত কোনো ডিগ্রি দেবিদ্বারের ১নং বড়শালঘর ইউনিয়নের বড় শালঘর মন্ত্রী বাড়ির বাসিন্দা নিরঞ্জন সরকার দীর্ঘদিন যাবৎ নিজেকে ‘মা ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ’ পরিচয়ে বিভিন্ন বাজার ও ফার্মেসিতে রোগী দেখছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—স্বীকৃত কোনো চিকিৎসা ডিগ্রি, সরকারি নিবন্ধন বা গ্রহণযোগ্য প্রশিক্ষণ ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দেওয়ার নামে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি সৈয়দপুর বাজার, এগারোগ্রাম, গোপালনগর, প্রজাপতি, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ও মুরাদনগরের বাঙ্গরা বাজার থানার জানঘরসহ অন্তত ছয়–সাতটি স্থানে নিয়মিত বসে রোগী দেখেন। প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে ভিজিট আদায়সহ নিজেকে “সব রোগের বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রচারণা চালান।ভুল চিকিৎসা, শিশু মৃত্যুর অভিযোগ—তবু নেই সরকারি তদন্ত একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেছেন, নিরঞ্জন সরকারের ভুল চিকিৎসায় কিছু রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কয়েকটি শিশুমৃত্যুর ঘটনাও তার চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ ব্যাপারে কোনো সরকারি তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক নথিভুক্ত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগ সত্য কিনা তা স্পষ্ট নয়।
ফার্মেসি ঘিরে গড়ে ওঠা দালালচক্র স্থানীয়দের অভিযোগ—যেসব ফার্মেসিতে তিনি রোগী দেখেন, সেখানে একটি দালালচক্র গড়ে উঠেছে। এ চক্রের সদস্যরা রোগী সংগ্রহ, ভিজিট নেওয়া, প্রেসক্রিপশন বানানো এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে ভূমিকা রাখে। সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহে গেলে তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।নারী–সংক্রান্ত অভিযোগে সালিশ, বাজারে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা প্রায় এক যুগ আগে নারী সংক্রান্ত একটি অভিযোগের জেরে সৈয়দপুর বাজারে এক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন—ঘটনাটির পর নিরঞ্জন সরকারকে বাজারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। নারীদের বিভ্রান্ত করা ও অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও এলাকায় প্রচলিত। তবে এর কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করলে নিরঞ্জন সরকার সাংবাদিকদের প্রতি অশোভন আচরণ ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।সচেতন নাগরিকদের দাবি: জরুরি তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি, নিবন্ধন বা সরকারি অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা আইনত অপরাধ—এমনটি জানান সচেতন স্থানীয় নাগরিকরা। তাদের মতে, নিরঞ্জন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বড় ধরনের অপরাধ।
স্থানীয়দের দাবি—ভুয়া চিকিৎসা সেবা,দালালচক্রের তৎপরতা,ভুল চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের বিষয়,সাংবাদিক হুমকির ঘটনা—এসব নিয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ চিকিৎসার আশায় এসব তথাকথিত চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রতারিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অপচিকিৎসার কারণে মানুষ যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছেন, তেমনি দেশের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থাও কমে যাচ্ছে।