
আবু সাঈদ চৌধুরী:
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির জন্ম ১৭৯৬ সালে জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের হাতে। “সদৃশে সদৃশ্য নিরাময়” নীতি অনুসারে এই চিকিৎসা রোগের উপসর্গ অনুযায়ী ক্ষুদ্র মাত্রায় উপাদান ব্যবহার করে রোগ নিরাময় করে।
বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রবেশ করে এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ড গঠন এবং Homoeopathic Practitioners Ordinance, 1983 প্রণয়ন করে এই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে।
দেশের প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম স্তম্ভ হোমিওপ্যাথি। কিন্তু পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক ‘ডা.’ উপাধিটি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে এই চিকিৎসক সমাজকে আজও আইনি ও প্রশাসনিক এক জটিল দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
২০১৪ সালে হাইকোর্টের একটি রায়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের নামের আগে ‘ডা.’ পদবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ আইনি লড়াই ও চেষ্টার ফলস্বরূপ ২০২৩ সালে জাতীয় সংসদে পাশ হয় ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও শিক্ষা আইন, ২০২৩’।
এই আইনের ধারা ২(১৩)-এ স্পষ্টভাবে ‘হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক(Homeopathic Doctor)” অর্থ এই আইনের অধীন নিবন্ধিত কোন হোমিওপ্যাথিক ডা.। সংসদীয় এই আইনকে হোমিও চিকিৎসকদের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখা হয়, যা তাদের দীর্ঘদিনের দাবিকে আইনি বৈধতা দিয়েছে। তাছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ২(১২) অনুচ্ছেদ মতে চিকিৎসক’ অর্থ বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৬১ নং আইন) এর ধারা ২ এর দফা (১৬) এবং (১৮) এ সংজ্ঞায়িত যথাক্রমে স্বীকৃত ডেন্টাল চিকিৎসক ও স্বীকৃত মেডিক্যাল চিকিৎসক; এবং Bangladesh Homeopathe Practitioners Ordinance, 1983 (Ordinance XLI of 1983) অনুসারে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অথবা স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হইতে হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রিধারী ব্যক্তি এবং Bangladesh Veterinary Practitioner Ordinance, 1982 (XXX of 1982) এর section 2(g) তে সংজ্ঞায়িত Registered Veterinary Practitioner।
কিন্তু, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১০ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপন (Office Order) এই স্বস্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশে একটি স্ববিরোধী বক্তব্য নজরে এসেছে। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও শিক্ষা আইন-২০২৩ এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা ‘ডা.’ পদবি ব্যবহারের অধিকারী। কিন্তু অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ধারা ২৯(১) এবং হাইকোর্টের পূর্বের রায়ের (হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং-২৭৩০/২০১৩ ও ১৩০৪৬/২০২৪) রেফারেন্সে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে শুধুমাত্র এমবিবিএস (MBBS) ও বিডিএস (BDS) ডিগ্রিধারীরাই ‘ডা.’ উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন।
আইন বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য খাতের পর্যবেক্ষকরা মন্ত্রণালয়ের এই আদেশকে ‘আইনগতভাবে দুর্বল’ ও ‘প্রশাসনিক বিভ্রান্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তাদের মতে, কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বা আদেশ কখনই জাতীয় সংসদে পাস হওয়া একটি মূল আইনের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যই হলো কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ও স্পষ্ট নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা। মন্ত্রণালয়ের এই দ্বিমুখী অবস্থান আইনের শাসনকে উতরে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছে।
হোমিও চিকিৎসকরা এ প্রজ্ঞাপনকে বৈষম্যমূলক এবং সংসদীয় স্বীকৃতিকে খর্ব করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এখানে প্রশ্ন জাগে-কার স্বার্থে এই প্রজ্ঞাপন জারি হলো? হোমিও চিকিৎসক মহলের ধারণা, স্বার্থান্বেষী একটি মহল ওষুধ ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রভাব খাটিয়ে বিকল্পধারার চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করছে। দেশে যখন ৬৪ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকরা স্বল্প খরচে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা দিচ্ছেন, তখন সরকারি প্রজ্ঞাপনের এই দ্বিমুখী অবস্থান মূলত সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারকে খর্ব করছে।
সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ শতাংশ রোগী বিকল্প চিকিৎসার (হোমিও, আয়ুর্বেদ, ইউনানি) ওপর নির্ভরশীল। শহর ও গ্রামে চিকিৎসা খরচের ক্রমবর্ধমান বোঝা বহন করতে না পেরে অনেকেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখছেন। অথচ এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থাকে খাটো করার প্রচেষ্টা শুধুমাত্র অযৌক্তিক নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশে প্রায় ৫০,০০০ নিবন্ধিত হোমিও চিকিৎসক জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন। তাদের পেশাগত মর্যাদা ও আইনি নিশ্চয়তা না থাকলে দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই আইনি দ্বন্দ্ব সমাধান এবং সংসদীয় আইন অনুযায়ী হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান এখন সময়ের দাবি।