
কুমিল্লা:জেলার মুরাদনগর উপজেলার কুমিল্লা মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডি গঠনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় তা অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
নির্বাচন ছাড়াই কমিটি গঠন ও পদত্যাগ:
২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ সদস্যের এই পূর্ণাঙ্গ গভর্নিং বডি অনুমোদন করে। এতে সভাপতি হিসেবে মো. সাইফুর রহমান খন্দকার এবং সহ-সভাপতি হিসেবে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক মো. ইউনুস মিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোনো ধরনের নির্বাচন ছাড়াই, কমিটির অনুমোদন দিয়ে ‘খাতা-কলমের নাটক’ সাজিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই বিতর্কিত কমিটি গঠনের প্রতিবাদে বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত মুরাদনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. সফিউল আলম তালুকদার ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সভাপতির পরিবার গত ১৫ বছর ধরে মাদ্রাসার নেতৃত্বে রয়েছে এবং অধ্যক্ষ নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি।
**স্বজনপ্রীতি ও হত্যা মামলার আসামি কমিটিতে:**
নবগঠিত কমিটির সভাপতি মো. সাইফুর রহমান খন্দকার মাদ্রাসার সদ্য প্রয়াত সভাপতি খন্দকার শাহ সূফী মো. হাবিবুর রহমানের ছেলে। হাবিবুর রহমান প্রায় ১৬ বছর ধরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে মাদ্রাসাটিকে “ব্যক্তিগত খানকায়” পরিণত করার অভিযোগ ছিল।পিতার মৃত্যুর পর পুত্রকে একই পদে আদিষ্ট করায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, একই পরিবারের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণে মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
কমিটির সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ১৫ সদস্যের কমিটিতে অধিকাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। বিশেষভাবে, বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত রিফাত সরকার একসময় উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের সেক্রেটারি ছিলেন এবং তিনি একটি হত্যা মামলার (মামলা নং: জি.আর-১১৬/২০২৩) অন্যতম প্রধান আসামি।
এছাড়াও, অভিভাবক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মো. জলিল সরকার ও মো. আক্তার হোসেনের নাম তাদের অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
**অধ্যক্ষের ভূমিকা ও অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়া:**
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. আবু হানিফ, যিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী ওলামা লীগের নেতা বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে এই কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে। তবে অধ্যক্ষ আবু হানিফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কমিটি নিয়ম মেনেই গঠন করা হয়েছে এবং কমিটিতে থাকা কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার বিষয়ে তিনি অবগত নন।
নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি মো. ইউনুস মিয়া জানিয়েছেন, অধ্যক্ষের প্রস্তাবে তিনি কমিটিতে এসেছেন এবং যদি দলীয় লোকদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি পদত্যাগ করবেন।
**কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও এলাকাবাসীর দাবি:**
এই গুরুতর অভিযোগগুলো নিয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা রেজিস্ট্রারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, একটি পরিবার ১৬ বছর ধরে মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করে এটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছে এবং এবারও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়ে কমিটি গঠন করেছে। তারা এই কমিটি বাতিল করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, কামাল্লা মাদ্রাসার গভর্নিং বডি গঠনে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।