
ইমরান খাঁন :
আশুলিয়ায় এলপি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ অবস্থা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস সিলিন্ডার অবৈধ ভাবে মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে, আর সেই সংকটকে হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে। অভিযোগ উঠেছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী ও ভয়ংকর সিন্ডিকেট, যাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না।
সরকার নির্ধারিত প্রতি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য যেখানে ১৩০৬ টাকা, সেখানে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় একই সিলিন্ডার ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকার উপরেও বিক্রি করছে কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী।সরকারে নির্ধারিত ধারণকৃত মুল্যর দামে পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাসের বোতল। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা দর কষাকষির সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছেন না। দোকানদারদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে— “নিতে হলে এই দামেই নিতে হবে, না হলে গ্যাস দেওয়া হবে না।
নির্দিষ্ট দোকান ও গোডাউনকেন্দ্রিক অভিযোগ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে,আশুলিয়ার পূর্ব জামগড়া,বটতলা রমিছ উদ্দিন মার্কেট ইস্টার্ন হাউজিং নেক্সট কালেকশন রোড বটতলা এলাকায় অবস্থিত বৃহত্তম গ্যাস সিলিন্ডার মওজুদ কারখানা আশা মনি স্যানেটারী সহ বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ রাখা হচ্ছে।আশা মনি স্যানেটারী প্রতিষ্ঠানটির প্রোপাইটার মোঃ আশরাফ উদ্দিন সহ বিসমিল্লাহ ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক মোঃ রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ,গ্যাসের সংকট তৈরি হলেই এখান থেকে অতিরিক্ত দামে গ্যাস সরবরাহ করা হয় এবং সাধারণ ক্রেতাদের বিকল্প কোনো পথ খোলা রাখা হয় না। এলাকাবাসীর দাবি, দোকানের আড়ালে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকটের সময় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হয়।
লাইসেন্স নেই, তবু ব্যবসা বন্ধ হয় না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠান ও গোডাউনের অনেক গুলোরই নেই কোনো বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র কিংবা প্রয়োজনীয় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা ও বাজারের ভেতর শত শত গ্যাস সিলিন্ডার গাদাগাদি করে রাখা হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর কোনো নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত মজুদ শুধু অবৈধই নয়, এটি একটি চলমান মৃত্যুঝুঁকি।
প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও কার্যকর অভিযান চোখে পড়েনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদারকি এলেও রহস্যজনক কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“আমরা জানি কারা মজুদ করছে, কারা বেশি দামে বিক্রি করছে। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। কারণ এরা খুব ভয়ংকর। প্রতিবাদ করলে ব্যবসা, বাড়ি, এমনকি পরিবারের ক্ষতির হুমকি আসে।
আতঙ্কে কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা
ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও আতঙ্কের চিত্র স্পষ্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন,
“লাইসেন্স ছাড়া যেভাবে গ্যাস রাখা হচ্ছে, তা যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে গেলেই চাপ ও হুমকি আসে।”
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ গ্যাস সিন্ডিকেট নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করায় স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে চুপ হয়ে যান।
সাধারণ মানুষ জিম্মি
এই ভয়ংকর সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ একদিকে অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত বসবাস করছে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কেউ নেবে না বলেই আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।
এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিপর্যয় অনিবার্য।
সচেতন মহলের মতে, অবিলম্বে সমন্বিত অভিযান, লাইসেন্সবিহীন গোডাউন সিলগালা, চড়া দামে বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং হুমকির শিকার কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে আশুলিয়ায় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য।