
যদিও সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা এ সফরকালে সাধারণ কর্মী নিয়োগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, সামরিক, অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের এবং আঞ্চলিক শান্তির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা আসিয়ান সদস্য দেশ মিয়ানমারের নির্যাতিত নাগরিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং বন্ধ থাকা সাধারণ কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ ও গভীর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে কয়েকটি দেশ দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, মালয়েশিয়া ছিল তাদের অন্যতম। ১৯৭৮ সালে মাত্র ২৩ জন বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শ্রম অভিবাসনের যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৯২ সালে জনশক্তি নিয়োগ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ২০০৯, ২০১৬ ও ২০২১ সালে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া প্রায়শই হোঁচট খেয়েছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতি ও অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে মালয়েশিয়া সরকার ৩১ মে ২০২৪ থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে।
বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা না থাকায় প্রতিবছর যেভাবে বন্যার শিকার হচ্ছে কোটি কোটি মানুষ, পশু, ও ক্ষতি হচ্ছে ফসল ও সম্পদের সে ক্ষেত্রে জনগন ও সম্পদের সুরক্ষায় নদীগুলোর খনন এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। খননকৃত খাল ও নদীর পলি ও মাটি দিয়ে রাস্তা, শহর , বন্দর গড়ে তোলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করাও সম্ভব। ইট তৈরিতে আর উর্বর কৃষি জমি নষ্ট হবে না। তাছাড়াও, প্রতিবছর দুর্যোগ মোকাবিলায় লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, অনেক আগে থেকেই মালদ্বীপ বাংলাদেশ থেকে নদী খনন করে বালি ও মাটি নিতে আগ্রহ জানিয়ে আসছে।
বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র হতে পারে অল্প আয়তনের জনবহুল বাংলাদেশের জমিকে রক্ষায় মালয়েশিয়ার টানেলিং প্রযুক্তির প্রয়োগ করা। মালয়েশিয়া টানেলিং প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী দেশ, যার উত্তম দৃষ্টান্ত হলো ক্লাং ভ্যালি ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) এবং স্মার্ট টানেলের মতো মেগা-অবকাঠামো প্রকল্পগুলো। দেশটি বিশ্বের প্রথম অটোমেটিক টানেল বোরিং মেশিন (এ-টিবিএম) উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম দ্বৈত-কার্যকরী স্টর্মওয়াটার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রোড টানেল (স্মার্ট) এবং উন্নত টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) উদ্ভাবনে পথিকৃৎ হয়েছে।
যাতায়াত, পানি প্রবাহ এবং সুয়োরেজ ব্যবস্থাপনায় ত্রি স্তর বিশিষ্ট টানেল যে কোনো নগরের জন্য এখন উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। অস্ট্রেলিয়া মালয়েশিয়ার টানেল প্রযুক্তির প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর , চট্রগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন শহরে সুব্যবস্থাপনার জন্য মালয়েশিয়ার টানেল প্রযুক্তির প্রয়োগএ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। উভয় দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন (২৮-৩০ কোটি) ডলার। ওপর দিকে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ প্রায় ২.৫ থেকে ২.৬ বিলিয়ন (২৫০-২৬০ কোটি) ডলার।
মূলত বাংলাদেশ মালয়েশিয়া থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, পাম অয়েল, পেট্রোলিয়াম গ্যাস এবং রাসায়নিক দ্রব্যের মতো উচ্চ মূল্যের পণ্য আমদানি করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ইস্যু ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।
কনজুমার পণ্য ব্যবস্থাপনা, সাপ্লাই চেইন এবং পণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মালয়েশিয়ার সুশৃঙ্খল, ব্যবসা ও জনবান্ধব ব্যবস্থাপনা যা বাংলাদেশে প্রায়োগের জন্য প্রযুক্তি, কারিগরি ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বৃদ্ধি করে বৃহত্তর ভোক্তার বাংলাদেশ উত্তম পণ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারে বলে বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ অবদান রয়েছে। এমন কি বাংলাদেশি শিক্ষক ও বিজ্ঞানীদের এ ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ পদচারণা মালয়েশিয়া ও বিশ্ববীকৃত। সে সব প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে কাজ করা এবং কৃতিত্বপূর্ণ এসব বাংলাদেশী ব্যক্তিদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।মানব সম্পদে ভরপুর বাংলাদেশ মানব সম্পদ উন্নয়নে মালয়েশিয়াকে আহ্বান জানাতে পারে। স্কিল প্রশিক্ষণ প্রদান করে বিশ্বের যে কোনো দেশের কর্মের উপযুক্ত করে তোলে এখন সময়ের দাবী। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শিক্ষা সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও ক্রমবর্ধমান। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, যা দেশটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। তবে পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে চাকরি খোঁজার সুযোগ (“গ্র্যাজুয়েট পাস”) দেওয়ার মত গুরুত্বপুর্ন বিষয় রয়েছে। অন্যথায় পড়ালেখা শেষে নিজ দেশে ফেরত যেতে হয়। হালাল বাণিজ্য খাতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
মালয়েশিয়ার উন্নত চিকিৎসা, আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচের কারণে মালয়েশিয়া এখন বাংলাদেশিদের জন্য একটি জনপ্রিয় মেডিকেল ট্যুরিজম গন্তব্য হয়েছে । মালয়েশিয়ার কেপিজে বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষ করে নার্স তৈরি ও চিকিৎসা সেবায় বিনিয়োগ করেছে যা খুবই সীমিত পরিসরে। তাদেরসহ অন্যান্য সুনামের অধিকারী মালয়েশিয়ান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে প্রযুক্তি, কারিগরি ও ব্যবস্থাপনায় যৌথ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা গেলে উভয় দেশ উপকৃত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ঐতিহাসিকভাবে ব্যাক-এন্ড অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং (এটিপি)-এ তার আধিপত্যের জন্য সুপরিচিত। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
শিক্ষাবিদ ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী সফরে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক নিশ্চিত করা, সেমিকন্ডাক্টর ও আইটি খাতে দক্ষ প্রকৌশলী নিয়োগের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, স্মার্ট এগ্রিকালচার ও কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতা এবং মালয়েশিয়ার শিক্ষা উন্নয়ন মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার সানওয়ে ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্টেন প্রফেসর ড. খালেদ শুকরান মনে করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদারে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গত পাঁচ দশকে শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। ফলে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার হবে দক্ষতা-নির্ভর। তাই কনস্ট্রাকশন, ড্রাইভিং, আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। ভাষাজ্ঞান ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের প্রস্তুত করা গেলে তারা উচ্চ বেতন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সকলে প্রত্যাশা করে।
এ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।